শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সহজ উপায়
শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সহজ উপায়
করোনা ভাইরাস মূলত আমাদের দেহের Immune System বা রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতার পরীক্ষা নেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি হলে সহজে দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগ খুব কম থাকবে।
শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা Immune system বাড়ানোর সহজ উপায়ঃ ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি, ম্যাগনেসিয়াম, সেলেনিয়াম, জিংক সমৃদ্ধ খাবার শরীরে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ায়। সাথে নীচে উল্লেখিত তালিকায় নজর রাখুনঃ
১। ভিটামিন ডি আমাদের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। যাদের শরীরে Vitamin D বেশি বা নরমাল, তাদের শরীরে Respiratory Virus Infection হওয়ার সম্ভবনা ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কম। ভিটামিন ডি সহজে পেতে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সূর্যালোকে ১০ থেকে ১৫ মিনিট করে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার থাকলে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি এর ঘাটতি পূরণ হবে। এছাড়া তৈলাক্ত মাছ বা সামুদ্রিক মাছে, দুধ, দই, ডিমের কুসুম, মাশরুম ইত্যাদিতে ভিটামিন ডি পাবেন।
২। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি দারুণ কার্যকর। ভিটামিন সি মানবদেহের কোষের পাওয়ার হাউস নামে খ্যাত মাইটোকন্ড্রিয়া কে রক্ষা করতে পারে। করোনা ভাইরাসের টার্গেট হচ্ছে মাইটোকন্ড্রিয়া, যার মাধ্যমে virulence এর বৃদ্ধি ঘটায়। শরীরের ভেতরে বিক্রিয়ার কারণে যেসব কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেগুলো সারিয়ে তুলতে কাজ করে ভিটামিন সি।
ভিটামিন সি আমলকী, লেবু, কমলা, পেয়ারা, জাম্বুরা, আমড়া, পেয়ারা, পেঁপে, কাঁচা মরিচ, সরিষা শাক ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে থাকে। যেহেতু মানব দেহ ভিটামিন সি জমা করে রাখতে পারে না, তাই প্রতিদিন গ্রহণ করা প্রয়োজন। পূর্ণবয়স্ক একজন পুরুষের দৈনিক ৯০ মিলিগ্রাম এবং একজন নারীর ৮০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি দরকার।
৩। মৌসুমি যে কোন দেশীফল, মধু, রসুন, কাঁচা হলুদ, আদা, কালিজিরা, তিশী, মেথি, অশ্বগন্ধা, পিপুল, তুলসী, ত্রিফলা, শজনে বা সাজনা, লেবু, পুদিনা পাতা, ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ায়।
ঝাল তরকারি মানবদেহের উত্তাপ বাড়িয়ে রক্ত সঞ্চালন করে তাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
৪। অটোফেজিতে শরীরে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ে। উপবাস বা কিছু না খেয়ে ১৬ ঘন্টা থাকলে অটোফেজি এক্টিভেট হয় শরীরে। নানা রকমের ফাস্টিংয়ের অস্তিত্ব আছে। শুধু পানি লবণ খেয়ে, শুধু ফল খেয়ে, ১৬ ঘন্টা, ৩৬ ঘন্টা, ৭২ ঘন্টার নানান প্যাকেজ আছে। মূল বিষয় অটোফেজি এক্টিভ করা।
ফাস্টিং বা উপবাস করাকালীন বিট লবন খাবেন যেন খনিজ ঘাটতি না হয়।
৫। অঙ্কুরিত বীজ রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ায়। অঙ্কুরিত বীজ বা Sprouts এ প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, মাঙ্গানিজ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফলেট (ভিটামিন-বি) উচ্চমাত্রায় থাকে। মানুষ নিজ দেহে তৈরি করতে পারে মাত্র ১১টি এম্যাইনো এসিড। মানুষকে খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয় ৯টি এম্যাইনো এসিড, যার সবগুলিই অঙ্কুরিত বীজে থাকে।
৬। লাল চালে বিদ্যমান সেলেনিয়াম শরীরে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ায় ।চালের সবচেয়ে পুষ্টিকর অংশ বাহিরের লালচে বা বাদামী আবরণ পালিশ করে তুলে ফেলে ভিতরের শুধুমাত্র শর্করা অংশ খাওয়ার ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে।
সেলেনিয়ামের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উৎস হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান নাটস বা বাদাম। প্রতিদিন মাত্র ২ টি নাটস বা বাদাম খেলে পূরণ হবে দৈনিক সেলেনিয়ামের চাহিদা। এছাড়া, টুনা ফিশ, টার্কি মুরগী, চিংড়ি, ডিম প্রভৃতিতে সেলেনিয়াম রয়েছে।
৭। সকল প্রকার শাক শরীরে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ায়।
সবধরনের শাক ও সবজি একত্রে মিশিয়ে রান্না করে খেলে শরীরে রোগ ব্যাধি হয় না বলে গ্রাম বাংলার মানুষ বিশ্বাস করে। সকল প্রকার শাক সবজি দিয়ে রান্নাকরা পাঁচন ও খুব উপকারী ও রোগ প্রতিরোধী। ঋতু পরিবর্তনজনিত রোগব্যাধির হাত থেকে বাঁচার জন্য পাঁচন ও শাকসবজি, ফলমূল খাওয়া খুবই প্রয়োজন।
৮। গুলঞ্চ শাক শাস্ত্রমতে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়াতে অতুলনীয়। জ্বর সর্দি কাশিতে গুলঞ্চ পাতা ভাজি ভীষনভাবে উপকারী।
৯। গাঢ় সবুজ রঙের শাক, কলা, মাছ, ডার্ক চকলেট, কাজু, ব্রাজিলিয়ান নাটস, পেস্তা বাদাম, কাঠ বাদাম, সূর্যমূখীর বীজ ইত্যাদিতে আছে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ায়।
১০। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও রোগ থেকে দ্রুত সেরে উঠতে ভিটামিন বি১২ দারুণ কার্যকর। বিভিন্ন দুগ্ধজাত খাবার ও ডিমে ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায়।
দুধ এবং কলিজার মধ্যে ভিটামিন বি আছে।
১১। শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি হলে রক্তে শ্বেতকণিকার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। বাদাম, শিম, দুগ্ধজাত পণ্যে জিঙ্কের পরিমাণ বেশি থাকে।
শিশুদের ক্ষেত্রে জিঙ্কের পরিমাণ কমে গেলে তারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
১২। উচ্চ আঁশ বা ফাইবার যুক্ত খাদ্য ডেটক্স প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে কিডনি লিভার পরিষ্কার করে। ভাইরাস এ টক্সিন উৎপাদন করে তা বিভিন্ন অঙ্গ আক্রমণ করে। অঙ্গ ভালো রাখতে আঁশ বা ফাইবার যুক্ত খাবার সাহায্য করে ও বন্ধু অণুজীবের খাদ্য বাড়িয়ে প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্ষম রাখে। দ্রবণীয় আঁশযুক্ত খাবারের মধ্যে আছে ওটমিল, শিমজাতীয় খাবার (মটর, শিম, ডাল), বার্লি, ফল ও সবজি (কমলা, অ্যাপল ও গাজর)। বিভিন্ন বীজ, ফলের খোসা, গমের রুটি, লাল ও বাদামি চালের ভাতে অদ্রবণীয় আঁশ থাকে।
১৩। ভিটামিন 'বি' এবং 'সি' পানিতে মিশে যাওয়ার কারণে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়। ফলে এগুলো শরীরে জমা হয়না।
প্রতিদিনই কিছু পরিমাণে ভিটামিন বি এবং সি জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : Dr-Bipul Chowdhury ডা. বিপুল চৌধুরী


No comments