ই’তিকাফের বিস্তারিত আলোচনা ।



ই’তিকাফ কাকে বলে ?
ই’তিকাফ এর শাব্দিক অথ© - অবস্থান করা, আটকে রাখা । পারিভাষিক অথে© ই’তিকাফের নিয়তে পুরুষের এমন মাসজিদে অবস্থান করা যেখানে ৫ওয়াক্ত সালাত জামা’য়াতের সাথে আদায় করা হয় এবং মহিলা নিজ গৃহের সালাতের স্থানে অবস্থান করাকে ই’তিকাফ কলে ।

ই’তিকাফের উদ্দেশ্য কী ?
ই’তিকাফের উদ্দেশ্য দুনিয়ার সবধরনের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে তাঁর ইবাদতে এক টানা লেগে থাকা ।

মহিলাগণ কোথায় ই’তিকাফ করবে ?
মহিলাগণ তাদের নিজ গৃহে সালাতের স্থানে ই’তিকাফ করবে । যদি নিজ গৃহে সালাতের নিধা©রিত স্থান না থাকে তাহলে ই’তিকাফে বসার সময় একটি স্থান নিধা©ণ করে নিবেন । মহিলাদের মাসজিদে ই’তিকাফ করা মাকরূহ ।

ই’তিকাফের প্রকারভেদ
ই’তিকাফ তিন প্রকার,
১/ মানতের ই’তিকাফ এটা ওয়াজিব এবং তা শুদ্ধ হওয়ার জন্য সিয়াম শত©।মানতের ই’তিকাফ কমপক্ষে একদিন হতে হবে ।
২/ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ যা রমাদ্বন মাসের শেষ দশকে করতে হয় এবং এতেও সিয়াম শত©
৩/ নফল যা অল্প সময়ের জনও হতে পারে, তবে এতে সিয়াম শত© নয় । যেকোনো সময়ের জন্য নিয়ত করে মাসজিদে প্রবেশ করলেই নফল ই’তিকাফের সওয়াব পাওয়া যাবে ।

ই’তিকাফের ফযিলত ও উপকারিতা
ই’তিকাফের ফযিলত ও উপকারিতা অপরিসীম । কেননা দুনিয়ার সবধরণের ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিভৃতে, একাগ্রচিত্তে একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদতের জন্য ই’তিকাফ করা হয় । ই’তিকাফরত অবস্থায় দুনিয়ার সবধরণের পাপ থেকে বেঁচে থাকা যায় । ই’তিকাফকালীন বান্দা যেন মহান আল্লাহ তা’য়ালার গৃহে তার সামনে, সাব©ক্ষণিক উপস্থিত থাকেন ।সে কারণে বান্দার মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে প্রিয় ও সম্মানী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার প্রতি দয়া,অনুগ্রহ, ক্ষমা ও রহমাতের দৃষ্টিতে তাকান । ই’তিকাফকারীর  অবস্থানের পুরো সময়, পানাহার, ঘুম, বৈধ প্রয়োজন (পেশাব-পায়খানা) সবই ইবাদত হিসাবে গণ্য হয় ।
হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রা.) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বণ©না করেন, রসূল (স.) ই’তিকাফকারী সম্পকে© ইরশাদ করেছেন, ই’তিকাফকারী মাসজিদে আবদ্ধ থাকার কারণে সবধরণের পা থেকে বেঁচে থাকে এবং তার নেকীর হিসাবের মধ্যে সব©প্রকার নেকী সম্পাদনকারীর ন্যায় নেকী অন্তভু©ক্ত হয়ে থাকে । (ইবনে মাজাহ)
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে. একজন ইতিকাফকারী মাসজিদে আবদ্ধ হয়ে যেমন অনেক ইবাদতের সুযোগ পায়, তেমনি দুনিয়ার সম্ভাব্য অনেক নেকী থেকে সাধারণত বঞ্চিত হয় । যেমন, রোগীর সেবা, এতিম,বিধবা, নিঃস্বদের সহযোগিতা, মৃতের গোসল, জানাজা, মানবসেবা ইত্যাদিতে শরিক হওয়া থেকে সে বঞ্চিত হয়ে থাকে । যে কারণে উক্ত হাদিসে বলা হয়েছে যে, সে এইসব কাজেরও সওয়াব পেয়ে যাবে যদি তার তেমন নিয়ত থাকে ।
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বণি©ত, তিনি বলেন, রসুল (স.) প্রত্যেক রমাদ্বনে ১০ দিন ই’তিকাফ করতের কিন্তু যে বছর ইন্তিকাল করেছেন সে বছর তিনি ২০ দিন ই’তিকাফ করেছেন । (বুখারী)
ই’তিকাফ সব©শ্রেষ্ঠ আ’মাল যদি তা একনিষ্ঠতার সাথে হয়ে থাকে । (বাহরুর রায়িক)
শবে কদর প্রাপ্তির প্রসঙ্গ ও উদ্দেশ্য ছাড়াও মাহে রমাদ্বনের শেষ মুহূতে© ইবাদত-বন্দেগির পরিমান বৃদ্ধির সূবণ© সুযোগকে কাজে লাগানোর স্বাথে©ও ই’তিকাফ করা হয়ে থাকে । তাই যথাসাধ্য সবার ই’তিকাফের সুযোগ গ্রহণ করা উচিৎ ।

ই’তিকাফের মাসায়িল ও নিয়ম
১। রমাদ্বনের শেষ দশকের ই’তিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়া । পাড়া বা মহল্লার যেকোনো একজন যদি তা আদায় করে তাহলে অন্য সবাই দায়মুক্ত হয়ে যাবে । নতুবা সবাই গুনাহগার হবে ।
২। রমাদ্বনুল মুবারকের ২০ তারিখ আসরের পর সূয© ডোবার আগে ই’তিকাফের নিয়ত করে মাসজিদে প্রবেশ করতে হবে ।এরপর ২৯ বা ৩০ তারিখ সন্ধায় শরিয়তসম্মতভাবে শাওয়ালের চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে ই’তিকাফ শেষ করতে হবে ।
 ৩। কেও যদি ১০ দিনের পরিবতে© কেবল তিন দিন বা সাত দিন বা বিজোড় রাতগুলোতে ই’তিকাফ করে তাহলে সেটা হবে নফল ই’তিকাফ ।

ই’তিকাফের আদব
১।অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা । যথাসম্ভব নেক বিষয়ক আলোচনায় লেগে থাকা ।
২। উত্তম মাসজিদ নিবা©চন করা । যেমন মক্কা-মদিনার মাসজিদ বা জামে মাসজিদ ।
৩। বেশি বেশি কুরআন শরিফ তিলাওয়াত ও হাদিস পাঠ করা ।
৪।অধিক পরিমাণে যিকির করা ।
৫। ধমী©য় জ্ঞান শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেওয়া ।
৬। সিরাতুন নবী তথা মহানবী (স.) এর জীবনী পাঠ করা ।
৭। নবী-রসূল ও ওলীগণের জীবনী পাঠ করা ।
৮। শরিয়তের বিধান সংক্রান্ত কিতাবাদি পাঠ করা ।
৯। যেসব কথায় গুনাহ নেই আবার পাপও নেই এমন কথাও প্রযোজন ছাড়া না বলা ।

যে সব কারণে ই’তিকাফ নষ্ট হয়ে যায় ।
১। ই’তিকাফকারী শরিয়সম্মত প্রয়োজন এবং মানবীয় প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কোনো কারণে মাসজিদের বাহিরে গেলেই ই’তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে । শরিয়তসম্মত প্রয়োজন বলতে জুমআর সালাত আদায় করার জন্য বাহির হওয়া । আর মানবীয় প্রয়োজন বলতে মূত্রত্যাগ করার জন্য, উজু ও জরুরী গোসলের জন্য বাহির হওয়া ।

২। এই সব প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ার পরেও যদি অল্প সময়ের জন্য মাসজিদের বাহিরে অবস্থান করে, দাড়িয়ে কথা বলে, হাসি-ঠাট্টা করে, তাহলে সুন্নাত ই’তিকাফ বাতিল হয়ে যাবে ।

৩। যার শরীর থেকে জখম.কানপচা,বিড়ি-সিগারেটের গন্ধ, ঘাম ইত্যাদি কোনো রকম দুগ©ন্ধ বাহির হয় তার পক্ষে মাসজিদে ই’তিকাফ ঠিক নয় । তিনি বাড়িতে ই’তিকাফ করবেন ।

৪। ই’তিকাফরত ব্যক্তি বায়ু ছাড়ার জন্য মাসজিদের বাহিরে যেতে পারেন এবং এটাই হুকুম ।

(তথ্যসূত্র – ফাতাওয়ে আলমগীরী, রদ্দুল মুহতার, বাহরুর রায়িক ইত্যাদি ।

ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, ইনসাফ২৪বিডি, মুহাঃ আব্দুর রহিম

No comments

Powered by Blogger.